Dark Mode
Sunday, 26 May 2024
Logo
দানবের মধ্যে মানবতা

দানবের মধ্যে মানবতা

ইতালিয়ান মাফিয়ার জাপানি সংস্করণ হলো ‘ইয়াকুযা’। জাপানের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি তারা। ইয়াকুযা সংগঠনটা কুখ্যাত চাঁদাবাজি, লুটপাট, অস্ত্র চোরাচালান, ক্যাসিনো ব্যবসা, ড্রাগ, পর্নোগ্রাফি, বেশ্যাবৃত্তি ইত্যাদির মাধ্যমে টাকা কামানোর জন্যে। ধারণা করা হয়, এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সংগঠনে বর্তমানে প্রায় ১,০২,০০০ এরও বেশি সক্রিয় সদস্য আছে। চোখের পলকে খুনখারাবি করতেও দ্বিধা করে না তারা। কিন্তু বেশ কয়েকবার এই অপরাধী চক্রের অন্য চেহারাও দেখেছে বিশ্ব।

১৯৯৫ সালের ১৭ জানুয়ারি জাপানের ‘কোবে’ অঞ্চলে ৬.৯ মাত্রার এক ভূমিকম্প হয়। মুহূর্তেই ৬,৪৩৪ জন মানুষ পরিণত হয় লাশে। ৪৩,৭৯২ জন আহত হয়। ৩,১০,০০০ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। জাপান সরকার এই তিন লাখ উদ্বাস্তু মানুষকে সহায়তা দিতে হিমশিম খাওয়া শুরু করে। সরকারি ত্রাণ সাহায্য পৌঁছাতেও বিলম্ব ঘটতে থাকে কিছুটা। ঠিক এমন সময়ে ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে অন্তত ৫০টা ট্রাক এসে উপস্থিত হয় আক্রান্ত অঞ্চলে। ট্রাক হতে নেমেই ভলান্টিয়াররা পানি, স্যালাইন, ডায়াপার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, কম্বল এবং ঔষধ বিলাতে শুরু করে। ভলান্টিয়ারদের পুরো গলা এবং হাত কবজি পর্যন্ত ঢাকা ছিলো। কিন্তু তাতেও শরীরে আঁকা বিশেষ উল্কিগুলো নজর এড়ায়নি কারো। স্থানীয় মানুষজন দেখেই বুঝে ফেললো, এরা সবাই ইয়াকুযার সবচেয়ে বড় একটা শাখা ‘ইয়ামাগুচি-গুমি’ গ্যাংয়ের সদস্য। এই গ্যাংয়ের হেডকোয়ার্টার এই কোবে নগরীতেই। তারা মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরো জাপানে তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শাখাগুলোর মাধ্যমে বিশাল পরিমাণে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে ফেলে এবং দুর্যোগের রাতেই সেগুলো নিয়ে এসে উপস্থিত হয়। রাতের আঁধারে তাদের এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলে পরপর চারদিন। চারদিন পরে ঐ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য আসা শুরু করলে তারা ত্রাণ বিতরণ বন্ধ করে নিঃশব্দে সরে যায়।

.

একই ঘটনা আবার ঘটে ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের তোহোকুতে ভূমিকম্প এবং সুনামি ঘটলে। এই দুর্যোগে ১৫,৮৯৪ জন মানুষ মারা যায়। আহত হয় ৬,১৫২ জন। আরো লাখ খানেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এবারেও জাপান সরকারের আগে দ্রুত এগিয়ে আসে ইয়াকুযা। বিশেষত ইয়াকুযার দু’টা গ্যাং ‘সুমিয়োশি-কাই’ এবং ‘ইনাগাওয়া-কাই’। ঐ দুর্যোগের পরদিনই, অর্থাৎ ১২ মার্চ সকালে, তারা ৫০ টন খাদ্যসামগ্রী আর ঔষধ-পথ্য নিয়ে হাজির হয়ে যায়। এবারেও তারা তাদের শরীরের উল্কি এবং ইয়াকুযার সমস্ত চিহ্ন ঢেকে রেখে এসেছিলো। অনেকে হাতে গ্লাভসও পরেছিলো; যেটার থেকে অনেকে ধারণা করে, হাতের কাটা আঙ্গুল ঢাকতেই তাদের এই গ্লাভস পরা। সেবারে তারা ৫,০০,০০০ ডলারের প্রায় ২০০ টন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে দুর্গতদের মাঝে। পরে বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ সাহায্য এসে পৌঁছাতে শুরু করলে তারা যথারীতি কেটে পড়ে।

.

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে এই ব্যাপারটা। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইয়াকুযা যে জাপান সরকারের চেয়ে কতোটা শক্তিশালী এবং গোছানো, এই উদাহরণগুলো দিয়েই তা প্রমাণিত হয়। তারা নিজেদের যে সব পরিবহন মাধ্যম দিয়ে স্মাগলিংয়ের কাজ চালাতো; সেই সব ট্রাক, স্পিড বোট, হেলিকপ্টার ইত্যাদি দিয়েই তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পুরো জাপান হতে ত্রাণ সামগ্রী এনে জড়ো করে। সরকারি সাহায্য এসে পৌঁছানোর আগেই! তাদের সদস্যরাও যে কতোটা করিৎকর্মা এবং হাই-কমান্ডের প্রতি অনুগত, সেটাও প্রকাশ হয়ে পড়ে।

.

এই উদাহরণ দিয়ে কখনোই এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত হয় না যে, ইয়াকুযারা হচ্ছে দানবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহানুভূতিশীল সব মানুষ। তারা কখনোই সত্যিকারের ‘রবিন হুড’ ছিলো না। কিন্তু এই কথা সত্যি, নিজেদের শক্তিমত্তাকে খারাপ কাজে না লাগিয়ে ভালো কাজে লাগালে মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দেয়া সম্ভব। রাষ্ট্রীয় শক্তিও তখন হেরে যেতে বাধ্য হয় এই সবকিছু বদলে দেবার দৌড়ে।



Comment / Reply From