আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা অপরিশোধিত তেল, ভারতে যে কারণে দাম বাড়ছে

49

আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত দু’তিনমাস ধরে অস্বাভাবিক কম হলেও ভারতে কিন্তু চলতি মাসে পেট্রল ও ডিজেল রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে।

সরকার নিয়ন্ত্রিত অয়েল মার্কেটিং কোম্পানিগুলো (ওএমসি) এই জুন মাসেই একটানা প্রায় বাইশ দিন ধরে রোজ পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়ে চলেছে।

যার ফলে রাজধানী দিল্লির বাসিন্দারা ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রতি লিটার আশি রুপিরও বেশি দাম দিয়ে পেট্রল ও ডিজেল দুটোই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

মুম্বাই বা ভোপালে পেট্রলের দাম প্রায় নব্বই টাকা লিটারে পৌঁছে গেছে।

পেট্রল ও ডিজেলের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সারা দেশ জুড়ে সোমবার তুমুল বিক্ষোভ দেখিয়েছে – দেশের বিভিন্ন শহরে কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী এক ভিডিও বার্তায় সরকারের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন, এই করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশ যখন ইতিমধ্যেই সঙ্কটে, তখন যেন জ্বালানি তেলের এই বর্ধিত দাম অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়।

“সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জোর করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে” বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

ভারতে পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম কত হবে, সেটা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর সরাসরি নির্ভর করবে (‘লিঙ্কড’) – কেন্দ্রীয় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ২০১৪ সালেই।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ক্রুডের দাম এখন চল্লিশ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তা বিশ থেকে তিরিশ ডলারের মধ্যেই ছিল।

ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম এত কম হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রেতাদের পাম্পে জ্বালানি তেলের জন্য এত বেশি দাম দিতে হচ্ছে কেন, সে প্রশ্ন তাই সঙ্গত কারণেই উঠছে।

জ্বালানি তেলের দামে বেশিটাই ট্যাক্স

আসলে ভারতীয়রা যে দামে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল কেনেন, তার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন ধরনের সরকারি ট্যাক্স ও এক্সাইজ ডিউটি।

কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যের সরকার তেলের দামে এই ট্যাক্স বসিয়ে থাকে।

গত ১৪ই মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রল ও ডিজেলের দামে প্রতি লিটারে ৩ রুপি করে এক্সাইজ ডিউটি বাড়িয়ে দেয়।

এরপর ৫ই মে প্রতি লিটার পেট্রলে আরও ১০ রুপি ও প্রতি লিটার ডিজেলে আরও ১৩ রুপি এক্সাইজ ডিউটি বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই দুই দফা বাড়তি শুল্ক বসানোর মাধ্যমে সরকার ২ লক্ষ কোটি রুপি অতিরিক্ত কর আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছিল।

তবে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি এই শুল্কবৃদ্ধি সরাসরি গ্রাহকদের কাঁধে না-চাপিয়ে নিজেরাই অনেকটা ‘অ্যাবসর্ব’ করে নেয়, ফলে লকডাউনের মধ্যে টানা ৮২ দিন দেশে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও ভীষণভাবে কমে যাওয়ায় সে সিদ্ধান্ত রূপায়নে তেল কোম্পানিগুলির খুব সুবিধে হয়েছিল।

কিন্তু জুনের প্রথম সপ্তাহে ব্যারেল প্রতি ক্রুডের দাম আবার চল্লিশ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছতেই ভারতে তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় – যা থামার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

‘মূল্যবৃদ্ধির জন্য মহামারিই দায়ী’

সোমবার বিরোধী দল কংগ্রেস যখন সারা দেশে এই মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখিয়েছে, তখন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আবার এই সঙ্কটের জন্য দায়ী করেছেন করোনাভাইরাস মহামারিকে।

বার্তা সংস্থা এএনআই-কে তিনি বলেন, “এই মহামারির জন্য ভারত-সহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিই এক অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। এপ্রিল-মে মাসে ভারতে পেট্রলের চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেছে, অর্থনীতিতে যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে!”

দাম কমানোর ব্যাপারে সরাসরি কোনও আশ্বাস না-দিলেও ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, “এখন আবার ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়ছে। তেলের দাম নিয়ে কোনও পূর্বাভাস করা যায় না।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম একটু স্থিতিশীল হলে ভারতেও পেট্রল-ডিজেলের দাম স্থিতিশীল হয়ে যাবে বলে সরকার আশা করছে।”

মন্ত্রীর কথায় ইঙ্গিত ছিল, লকডাউনের সময় পেট্রল-ডিজেলের বিক্রি অসম্ভব কমে যাওয়ায় সরকারের যে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে সেটা পোষানোর চেষ্টাতেই জ্বালানি তেলের দাম এখন এভাবে বাড়াতে হয়েছে।

এদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতে জ্বালানি তেলের দামে বিরাট ফারাক তৈরি হওয়ায় সীমান্তে স্মাগলিং বা চোরাচালান বাড়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অতীতেও বহুবার দেখা গেছে, যখনই ভারতে ডিজেলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেকটা বেড়ে গেছে, তখনই দুদেশের শিথিল সীমান্ত পথে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডিজেল পাচার করতে শুরু করে দিয়েছেন।


Get real time updates directly on you device, subscribe now.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More