দক্ষিণের খবর | www.dokkhinerarthonity.com
M A KASHEM
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
আপডেট: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৭ পিএম
মেঘের রাজ্য সাজেক। পাহাড়ের সবুজ, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসেন পর্যটকেরা। কিন্তু সেই সাজেকেই এবার আনন্দভ্রমণের জায়গা দখল করে নেয় আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে।
ঘটনার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেয়।
স্থানীয়দের বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাজেক সড়কে অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। সকাল থেকেই সড়কের কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
এদিকে সাজেক থেকে ফেরার পথে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো গঙ্গারাম বাজার এলাকায় বাধার মুখে পড়ে। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিসহ বিপুলসংখ্যক পর্যটক আটকা পড়েন।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টার দিকে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো আটকে দেওয়া হয়।
এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু আলোচনার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, সকাল পৌনে ১১টার দিকে অবরোধকারীদের একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে।
এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়।
আইএসপিআরের দাবি, বেলা ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি চালান।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান বলে জানানো হয়।
তবে ইউপিডিএফ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা।
গুলির অভিযোগ ও সংঘর্ষের মধ্যেই সেনাবাহিনী এবং পুলিশ যৌথভাবে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, সংঘর্ষে সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্য এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। তবে কোনো পর্যটক আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় পর্যটকবাহী গাড়িগুলো খাগড়াছড়ির দিকে পাঠানো হয়।
ঘটনার বিষয়ে আইএসপিআরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে ইউপিডিএফ।
সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি।
তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি ভেঙে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই গুলি চালিয়েছেন।
অন্যদিকে আইএসপিআরের অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং তাঁদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে গুলির ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন স্থানীয় কয়েকটি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাড়িঘরে তল্লাশির নামে হয়রানি বন্ধ করা।
তবে পিসিজেএসএসের রাঙামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নগেন্দ্র চাকমা তাঁদের সংগঠনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বিরোধ ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই নতুন করে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
কেউ পরিবার নিয়ে পাহাড় দেখতে এসেছিলেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক দিনের ছুটি কাটাতে। কিন্তু ফেরার পথে সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের খবরে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদমাধ্যমকে এক পর্যটক জানান, অবরোধের কারণে তাঁদের গাড়ি আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় তাঁরা খাগড়াছড়িতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও এ ধরনের ঘটনা পাহাড়ে ভ্রমণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
সাজেক শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় বহু মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস।
এখানকার হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং ছোট ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবার।
সড়ক অবরোধ কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্যটক চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এসব ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সাজেকে পর্যটক যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য সাজেক। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। পর্যটনের পাশাপাশি এই অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পাহাড়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ।
কিন্তু বারবার অবরোধ, সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দা—উভয়ের ওপর।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক: মোহাম্মদ সেলিম উদ্দীন খান
নির্বাহী সম্পাদক: সাঈদ মোহাম্মদ আদনান খান
বার্তা সম্পাদক: আয়শা জান্নাত খানম
ডিজিটাল বস : মোহাম্মদ রাকিব হোসাইন খান
Email: joruribarta@gmail.com
Publisher & Editor In Chief:
Contact No:+880 1841632000
Address: Plot-371/A, Block-C, Bashundhara Residential Area, Baridhara. , Dhaka, Bangladesh, 1229
স্বত্ব দক্ষিণের খবর
Developed by Vida Team