বুকের পাকা কফ, কারন ও প্রতিকার

3,576
অধ্যাপক ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ
মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ইউনাইটেড হাসপাতাল, ঢাকা।
অনেক বক্ষব্যাধির কারণেই বুকে কফ পেকে যেতে পারে। কফ পেকে যাওয়া বলতে বোঝায় কফের রং হলুদ হয়ে যাওয়া। যে সব রোগের কারণে কফ হলুদ হয়ে যায় তার মধ্যে ফুসফুসে ফোঁড়া, ব্রংকিংএকটেসিস, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসসহ অনেক ধরনের বক্ষব্যাধি যেখানে জীবাণু সংক্রমণ ঘটে সেগুলোকে বোঝায়। ব্রংকিংএকটেসিস হলে বেশির ভাগ রোগীরই পাকা হলুদ কফ কাশির সঙ্গে নির্গত হয়। এটা ফুসফুসের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের ফলে ফুসফুসের কিছু শ্বাসনালিতে বড় ধরনের প্রদাহ দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থানের শ্বাসনালিগুলো তখন ফুলে মোটা হয়ে যায়। ব্রংকিংএকটেসিসের অন্যতম প্রধান উপসর্গই হলো দীর্ঘস্থায়ী কফ-কাশি। বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসকের কাছে আসে কাশির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে কফ পড়ার সমস্যা নিয়ে। ঘুম থেকে সকালে ওঠার পর কাশি বেশি হয়। একটু কাশিতেই প্রচুর পরিমাণে কফ বেরিয়ে আসে। যখনই জীবাণু সংক্রান্ত রোগী রক্ত স্বল্পতায় ভোগে, ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আঙ্গুলের মাথা মোটা হয়ে যায়। যাকে আমরা ক্লাবিং বলে থাকি। অনেক দিন ধরে এ রোগ চলতে থাকলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। ফুসফুসে ফোঁড়া হলেও হলুদ পাকা কফ কাশির সঙ্গে নির্গত হয়। ফুসফুসে ফোঁড়া বিভিন্ন রোগ জীবাণু দিয়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ফোঁড়া হতে দেখা যায়। ত্বকে ফোঁড়া হলে চিকিৎসক ছোট একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুঁজ বের করে দিয়ে এক কোর্স এন্টিবায়োটিক লিখে দেন। কিন্তু ফুসফুসের ফোঁড়া কাটাতে এত সহজ ব্যাপার নয়। বিভিন্ন ধরনের জীবাণু দিয়ে এই ফোঁড়া হতে পারে। তাই প্রকৃত চিকিৎসার সফলতা নির্ভর করে কোন জীবাণু এই রোগের আক্রমণকারী সেটা চিহ্নিত করা। যক্ষ্মার জীবাণু দিয়ে যদি এই ফোঁড়া হয়ে থাকে তবে তো আর সাধারণ এন্টিবায়োটিক দিয়ে কোনো কাজ হবে না। ফুসফুসে ক্যান্সার বা টিউমার হলে সেখানে জীবাণু সংক্রমণ হয়ে ফোঁড়ার সৃষ্টি হতে পারে। তবে স্টেফাইলোকক্কাস দিয়ে যে ফোঁড়া হয়, সেগুলো সংখ্যায় কয়েকটি হয়ে থাকে এবং ফোঁড়াগুলোর দেয়ালটা এত পাতলা থাকে যে, যে কোনো সময় সেটা ফেটে গিয়ে ফুসফুসের পর্দায় বাতাস জমা হয়ে নিউমোথোরাক্স তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া শরীরের অন্য স্থানে প্রদাহ থেকেও ফুসফুসে ফোঁড়ার জন্ম হতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হঠাৎ করে অথবা আস্তে আস্তে শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেশ জ্বর আসে এবং খুব কেঁপে জ্বর আসে। প্রচুর ঘাম হয়, বুক ব্যথা, কাশি থাকে এবং কাশির সঙ্গে পাকা দুর্গন্ধযুক্ত প্রচুর কফ যায়। ফুসফুসে ফোঁড়া হলে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে কাশির সঙ্গে রক্ত যায়। রক্তশূন্যতা দেখা যায় এবং ওজন বেশ কমে যায়। হাতের আঙ্গুলের মাথায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে যাকে আমরা ক্লাবিং বলে থাকি। কোন জীবাণু দিয়ে এই রোগ হয়েছে সেটা নির্ণয় করা সফল চিকিৎসার জন্য খুবই প্রয়োজন। কফে অনেক সময় আমরা ক্যান্সার সেলেরও সন্ধান করে থাকি। তবে এই রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্সে পরীক্ষা করে আমরা ফোঁড়ার সন্ধান পাই। আগেই লিখেছি আক্রমণকারী জীবাণুকে শনাক্ত করতে হবে। যথোপযুক্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে অনেক দিন যাবৎ। আমরা রোগীকে বিভিন্নভাবে শুইয়ে এবং বসিয়ে কফ ফেলার ধরন প্রশিক্ষণ দিয়ে পুঁজের মতো কফ নির্গত করার চেষ্টা চালাই। কারণ এই বিষাক্ত কফ বের করতে না পারলে হাজার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে কোনো আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া দুষ্কর। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগীর কফ ও জীবাণু সংক্রমিত হয়ে পেকে হলুদ হয়ে যেতে পারে।
.
ঘণ কফ দূর করার উপায়ঃ
ঋতু পরিবর্তনের ফলে বিশেষ করে শীতকালে আমাদের দেহে নানা প্রকার সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে সর্দি-কাশির প্রকপ থাকে সবচেয়ে বেশি।
এটি আরও মারাত্মক হয় যখন বুকে বসে যায়। খুব বেশী কফ জমে থাকার কারণে শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। তবে শুধু বড় মানুষরা না, বাচ্চারাও এই সমস্যার ভুগে থাকেন। বুকে জমে থাকা এই কফ দূর করার জন্য রয়েছে কিছু অসাধারণ ঘরোয়া উপায়। চলুন, দেখে নেওয়া যাক-
.
লেবু ও মধুর সিরাপ : এক চামচ মধুর সাথে লেবুর রস ও দারুচিনি গুঁড়া মিশিয়ে একটি সিরাপ তৈরি করুন। যখনই গলা খুসখুস করবে বা কফের কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হবে তখনই এই সিরাপটি খেয়ে নিন। তাছাড়া কুসুম গরম পানিতে লেবু ও এক চামচ মধু মিশিয়ে খেলে গলা পরিষ্কার থাকে।
.
আদা : বুকে জমে থাকা কফ দূর করতে আদা খুব ভালো কাজে দেয়। আদা চা কিংবা আদা পানি খেলে এই সমস্যার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আদা পানির জন্য এক গ্লাস গরম পানিতে আদা কুচি দিয়ে ফুটিয়ে নিন। পানি ভালোভাবে ফুটে উঠলে আদা ছেঁকে নিন এবং কুসুম গরম থাকা অবস্থায় খেয়ে ফেলুন। এছাড়া শুষ্ক কাশি এবং গলা খুসখুস ভাব কমানোর জন্য একটুকরো আদা মুখে নিয়ে রেখে দিতে পারেন।
.
হলুদ : শুধু অ্যান্টিসেপ্টিক নয়, হলুদে আছে কারকিউমিন নামক উপাদান যা জমে থাকা কফ দ্রুত বের করতে সাহায্য করে। এতে থাকা অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান গলা ব্যথা, বুকে ব্যথা দূর করতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন কুলকুচি করার জন্য এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। অথবা এক গ্লাস দুধে আধা চা চামচ হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে এর সাথে মধু মিশিয়ে খেয়ে নিন।
.
তরল খাবার : বুকে কফ জমে থাকার কারণে খাবারে কষ্ট হয়। তাই এই সময় বেশি করে তরল এবং গরম খাবার খেলে আরাম পাওয়া যায়। সারাদিন প্রচুর পানি, জুস, মুরগী ও সবজির স্যুপ বা তুলসী পাতার চা পান করুন।
.
গরম পানির ভাপ : ফুটন্ত গরম পানিতে মেন্থল দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। চুলা থেকে পানি নামিয়ে একটি বড় তোয়ালে দিয়ে মাথা ঢেকে নিন এবং ঘন ঘন শ্বাস নিন। এভাবে অন্তত ১০ মিনিট করে দিনে ২ বার ভাপ নিন। এতে বন্ধ থাকা নাক খুলে যাবে এবং বুকে জমে থাকা কফ বের হয়ে আসবে।
.
গরম দুধ: গরম দুধে মধু, হলুদ, গোলমরিচ মিশিয়ে খাওয়া বুক কফ জমা ও সর্দি-কাশি সারাতে অত্যন্ত উপকারী। হলুদে আছে ব্যাকটেরিয়া ও সংক্রমণ রোধকারী উপাদান, গোলমরিচ হজমে সাহায্য করে, সারায় কফ ও সর্দি। প্রতিদিন দুবার পান করতে হবে।
.
গড়গড়া করা : গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করলে গলা ব্যথা কমে যায়। এজন্য এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে আধা চা চামচ লবণ মিশিয়ে গড়গড়া করুন। এভাবে দিনে অন্তত তিনবার গড়গড়া করার চেষ্টা করুন। এটি কাশি কমাতে বেশ কার্যকর একটি ঘরোয়া উপায়।
.
কুসুম গরম পানি পান: ঠাণ্ডা লাগলে কুসুম গরম পানি পান করলে গলায় আরাম হয়। বুকে জমা কফও সেরে উঠতে থাকে ক্রমেই। শ্বাসনালী ও বুকে জমে থাকা সর্দি গলিয়ে ফেলতে কুসুম গরম পানি অত্যন্ত কার্যকর।
.
চা: আদা, পুদিনা-পাতা, ক্যামোমাইল, রোজমেরি মিশিয়ে চা বানিয়ে পান করাও এক্ষেত্রে বেশ উপকারী। চিনির বদলে মধু ব্যবহার করলে মিলবে বাড়তি উপকার। চা ভালো না লাগলে আদা চিবিয়ে খেতে পারেন।
.
বাষ্প: পানিতে ইউক্যালিপ্টাস তেল মিশিয়ে তার বাষ্প নিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে বুকে জমা কফ দূর করতে সাহায্য করবে। বাষ্প নেওয়ার সময় জোরে শ্বাস নিতে হবে, বন্ধ নাক ও বুকে জমা কফের অস্বস্তি থেকে আরাম মিলবে দ্রুত। ইউক্যালিপ্টাস তেলে আছে যন্ত্রণানাশক ও ব্যাকটেরিয়া রোধকারী উপাদান যা এতে সহায়ক।
.
ব্ল্যাক কফি: অস্বস্তি থেকে সাময়িক আরাম মেলে ব্ল্যাক কফি পান করলে। আর জমে থাকা সর্দি গলাতেও উপকারী। তবে দিনে দুই কাপের বেশি পান করা যাবে না, কারণ অতিরিক্ত ক্যাফেইন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
.
পেঁয়াজের নির্যাস: এতে থাকা ‘কুয়ারসেটাইন’ সর্দি দূর করে এবং আবার জমতে বাধা দেয়, সংক্রমণ থেকেও বাঁচায়। পেঁয়াজের রস বের করে তাতে লেবুর রস, মধু ও পানি মিশিয়ে নিতে হবে। পরে কুসুম গরম করে পান করতে হবে প্রতিদিন তিন থেকে চারবার। তবে ঘরোয়া এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের আগে উপকরণগুলোতে ব্যক্তিগত সমস্যা আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
.
আরো কিছু ঘোরোয়া পদ্ধতিঃ
প্রথম পদ্ধতি
বুকে জমা কফ গলিয়ে ফেলতে গারগল করাটা খুব জরুরী। এক গ্লাস হাল্কা গরম পানির মধ্য অল্প লবন মিশিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে তিনবার গারগল করতে হবে। দিনে তিনবার বা তার অধিক সময়ে যদি গারগল করা যায় তাহলে গলার রুক্ষতা এবং জমে থাকা সর্দি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
.
দ্বিতীয় পদ্ধতি
রান্নার কাজে ব্যবহৃত হলুদের মধ্যে বিভিন্ন গুণ রয়েছে। সর্দির উপশমেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল হাল্কা গরম পানির মধ্যে গুঁড়ো হলুদ মিশিয়ে গারগল করলে তা অত্যন্ত উপকারি। তবে যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে তাদের এই পদ্ধতি ব্যবহার না করাই ভাল।
.
তৃতীয় পদ্ধতি
পেঁয়াজের মধ্যে এমন কিছু উপাদান আছে যা বুকের মধ্যে জমে থাকা সর্দিকে গলিয়ে দিতে পারে। এর জন্য প্রতিদিন তিন চামচ করে পেঁয়াজের রস খেতে হবে। সর্দি জমে থাকলে এই উপকরনটি ব্যবহারে উপকার পেতে পারেন।
.
চতুর্থ পদ্ধতি
বুকে জমে থাকা সর্দির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এই পদ্ধতিটি খুব কম প্রচলিত। যদিও এতে বেশি কিচ্ছু করতে হয় না। শুধুমাত্র ফুটন্ত গরম পানির মধ্যে কয়েক ফোঁটা ইউকালিপটাস তেল মিশিয়ে নিতে হয়। এর পর মিশ্রণ থেকে থেকে যে বাষ্প বের হয় তা নাক এবং মুখ দিয়ে টানতে হয়। তবে বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যারা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন তাদের এই পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিৎ নয়।
.
পঞ্চম পদ্ধতি
পানির মধ্যে লেবু এবং মধু মিশিয়ে খেলে সর্দির থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। লেবু মধ্যে থাকা ভিটানিম ডি জমা সর্দি কে গলিয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে মধু খেলে কাশির উপশম হয়। তাই বুকের মধ্যে সর্দি জমে গেল লেবু এবং মধু-পানির মধ্যে মিশয়ে খাওয়া যেতে পারে।
.
ষষ্ঠ পদ্ধতি
বুকে সর্দি জমে থাকলে অনেক সময় বুকে ব্যথার সৃষ্টি হয়। এর থেকে মুক্তি পেতে একটি সহজ ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। ছোট কাপড়ের টুকরো গরম পানির মধ্যে ডুবিয়ে বুকের মধ্যে তা মালিশ করলে অনেক আরাম পাওয়া যায়।
.
সপ্তম পদ্ধতি
আদার মধ্যে যে সব উপাদান রয়েছে তা সর্দির উপশমের জন্য বেশ উপকারি। বুকে মধ্যে সর্দি জমে থাকার ফলে বুকে ব্যাথা এবং ঘন ঘন কাশির সমস্যা দেখা যায়। এর থেকে মুক্তি পেতে আদা চা খাওয়া যেতে পারে যা কাশির জন্য অব্যর্থ।

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com