চট্টগ্রামে বৈশাখের ঐতিহ্য লোকজ মেলা ও জব্বারের বলীখেলা

50

চট্টগ্রামে বৈশাখের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে লোকজ মেলা ও বলীখেলা। বৈশাখী সংস্কৃতির অংশ হিসেবে এখানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হয় আবদুল জব্বারের বলীখেলাকে ঘিরে।

এটাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ১২ বৈশাখ নানা রঙে রঙিন হয়ে বৈশাখ হাজির হয় চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে। নগরায়ণের থাবায় লোকজ উৎসব ক্রমশ হারিয়ে গেলেও চট্টগ্রামে জব্বারের এ বলীখেলা এরই মধ্যে অতিক্রম করেছে শতবছরের ঘর।

নানা প্রতিকূলতার মাঝেও চট্টগ্রামের মানুষ লোকজ এ সংস্কৃতি ধরে রাখায় ব্রিটিশ ফিল্ম বিভাগ ডকুমেন্টারি ফিল্ম হিসেবে জব্বারের বলীখেলার ছবি ধারণ করে সযত্নে সংরক্ষিত রেখেছে লন্ডনের ফিল্ম আর্কাইভে।

দিন দিন বলীখেলার জনপ্রিয়তা বাড়ছে চট্টগ্রামে। তাই তো ৯ বছর ধরে বৈশাখের প্রথম দিনেই নগরীর সিআরবিতে নানা জৌলুসে হাজির হচ্ছে সাহাবউদ্দিনের বলীখেলা। একইভাবে বৈশাখ এলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মক্কার বলীখেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলীখেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলীখেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলীখেলা ও কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয় ডিসি সাহেবের বলীখেলা। প্রতিটি বলীখেলাকে ঘিরে আশপাশের এলাকায় বসে বৈশাখী মেলা। তবে আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে জব্বারের বলীখেলাকে ঘিরে লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়া বৈশাখী মেলা। এবার লালদীঘিতে বসবে জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার ১০৯তম আসর।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন বলেন, ‘১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। বাঙালি সংস্কৃতি লালনের পাশাপাশি বাঙালি যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলীখেলার প্রবর্তন করেন।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামিদামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন। দেশ বিভাগের পূর্বে একবার এক ইংরেজ গভর্নর সস্ত্রীক আবদুল জব্বারের বলীখেলা দেখতে এসেছিলেন বলে জানা যায়। আবার ১৯৬২ সালে দু’জন ফরাসি মল্লবীর আবদুল জব্বারের বলীখেলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখন বিদেশ থেকে কোনো বলী না এলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিবছর জব্বারের এ বলীখেলায় অংশ নেয় অর্ধশত বলী।’

 

জব্বারের বলীখেলা ও মেলাকে ঘিরে নগরজুড়ে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। নগরবাসীর মনে দেখা দেয় বাড়তি আনন্দ। দূর-দূরান্ত থেকে বলীখেলা দেখতে ও মেলায় ঘুরতে আসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষ। তীব্র গরম ও ভিড় উপক্ষো করে সবাই ঘুরে বেড়ায় মেলার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। নগরীর আন্দরকিল্লা, বক্সিরহাট, লালদীঘি পাড়, কেসিদে রোড, সিনেমা প্যালেস, শহীদ মিনার সড়ক, কোতোয়ালি মোড়, জেল রোডসহ তিন কিলোমিটারজুড়ে এ মেলার বিস্তৃতি ঘটে।

এ সময় সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে তিন দিনের জন্য। যাতায়াত ব্যবস্থায় জনসাধারণের সাময়িক দুর্ভোগ হলেও এই বলীখেলার উৎসবে এসে চট্টগ্রামবাসী সবকিছুই ভুলে যান এক নিমিষে। মেলা জমজমাট করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দু’তিন দিন আগেই নানা পসরা নিয়ে আসেন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসায়ীরা। তারা সড়কের দু’পাশ জুড়ে চৌকি বসিয়ে আবার কেউ মাটিতে চট বিছিয়ে সাজান মেলার পসরা। মেলার মধ্যেই কাটান তারা দিন ও রাত। এখানেই চলে খাওয়া-দাওয়া। কাটে তাদের নির্ঘুম রাতও।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জানান, দেশের কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ মেলা। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ জব্বারের বলীখেলা হলেও তিন দিনের লোকজ মেলা শুরু হয় ১১ বৈশাখ থেকে। নিত্যব্যবহার্য ও গৃহস্থালি পণ্যের প্রতিবছরের চাহিদা এ মেলাতেই মেটান চট্টগ্রামের গৃহিণীরা। কারণ হাতপাখা, শীতলপাটি, ঝাড়ু, মাটির কলস, মাটির ব্যাংক, রঙিন চুড়ি, ফিতা, হাতের কাঁকন, বাচ্চাদের খেলনা, ঢাকঢোল, মাটি ও কাঠের পুতুল, বাঁশি, তৈজসপত্র, আসন, চৌকি, খাট, আলমারি, ফুলদানি, তালপাখা, টব, হাঁড়ি-পাতিল, দা-ছুরি, কুলা-চালুন, টুকরি, পলো, বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা, মুড়ি, মুড়কি, লাড্ডু, জিলাপি সবই মেলে এ মেলায়।

চট্টগ্রামকে বলা হয় বীরের শহর। বলী থেকেই এই বীর উপাধি পেয়েছে চট্টগ্রামবাসী। সাধারণভাবে প্রচলিত আছে এখানকার মানুষ দৈহিকভাবে শক্তিশালী। কারণ কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল বা পালোয়ান উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবারের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাসও। পটিয়ার আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, আনোয়ারা চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, বাঁশখালীর কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদণ্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, বোয়ালখালী পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ। বংশানুক্রমিকভাবে এদের পছন্দ শারীরিক কসরত প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলীখেলার প্রধান আকর্ষণ। ছিলেন বলীখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণাও।

নানা বর্ণিল আয়োজনে বর্ষবরণ ও বর্ষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। এবারও নতুন বর্ষকে বরণ করতে লোকজ নানা উৎসব বসবে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এসব উৎসবে থাকবে কাবাডি, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, পুতুল নাচ, সাপের খেলা, ঘুড়ি উৎসবসহ নানা অনুষ্ঠান। কালের বিবর্তনে অনেক খেলা-মেলা হারিয়ে গেলেও বৈশাখকে ঘিরে আবার বসবে প্রাণের মেলা।

সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক আহমেদ ইকবাল হায়দার জানান, পহেলা বৈশাখ চট্টগ্রামের ডিসি হিলে বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ‘সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ’-এর ব্যানারে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি আয়োজন করে আসছেন চট্টগ্রামের সংস্কৃতি কর্মীরা। এখানে ঢোলের বাড়ি, বাঁশির সুর, নাচ-গান আর বর্ণাঢ্য সব আয়োজনে পহেলা বৈশাখের কর্মসূচি উদযাপন করা হয়। এ সময় ডিসি হিল ও এর আশপাশের এলাকায় পাওয়া যায় বাঙালির প্রাণের উৎসবের আমেজ।

পহেলা বৈশাখে নগরীর সিআরবির শিরিষ তলায় ‘বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদের’ আয়োজনে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগদানকারীরা সমবেত কণ্ঠে রবিঠাকুরের লেখা বাঙালির প্রাণের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গেয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করে। গত ৯ বছর ধরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি শিরিষ তলার এ আয়োজনে থাকে সাহাবুদ্দিনের বলীখেলাও। এ ছাড়া নগরীর চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ‘জাগো বাঙালি নবরূপে নব আনন্দে জাগো’ স্লোগানে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এখানকার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগে বের হয় এ শোভাযাত্রা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণ র‌্যালি। সকালে জারুল তলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে থাকে নাটক, গান ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। দুপুরে মুক্তমঞ্চে বলীখেলা এবং বুদ্ধিজীবী চত্বরে চলে কাবাডি, পুতুল নাচ ও বৌচি খেলা।

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিও আট বছর ধরে উদযাপন করে আসছে বৈশাখী উৎসব। নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে উৎসবের আয়োজন করে ‘চট্টগ্রাম উৎসব ও বর্ষবরণ পরিষদ’। দিন যত যাচ্ছে ততই যেন রঙিন হচ্ছে চট্টগ্রামে বৈশাখী উৎসব। বৈশাখের পুরো মাস ধরে নানা আয়োজনে ধরে রাখছে শত বছরের ঐতিহ্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com