দেশে জনশক্তি রফতানির বেহাল দশা

84

অর্থনীতির অন্যতম মেরুন্ড রেমিট্যান্স, যা বিশে^র বিভিন্ন দেশে কর্মরত ১ কোটির অধিক বাংলাদেশি দেশে পাঠান। যাদের হাত ধরে ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার আসছে বাংলাদেশে সেই জনশক্তি খাত ভালো নেই। মহামারী করোনার কারণে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে জনশক্তি রফতানি। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, করোনার কারণে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। ফলে লাখ লাখ বাংলাদেশে শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন বিদেশের মাটিতে। তাছাড়া এসব কাজ হারানো শ্রমিককে দেশে পাঠানোরও উদ্যোগ নিচ্ছে অনেক দেশ। এ অবস্থায় সরকারকে দ্রæত প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা মধ্যপ্রাচ্য। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বাজার সৌদি আরব। তারপর রয়েছে ওমান, কাতার, জর্ডান ও কুয়েত। ইরাকেও অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। তা ছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লিবিয়া, লেবানন এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশ বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান জায়গা। কিন্তু মহামারী করোনার কারণে বাংলাদেশসহ আক্রান্ত কয়েকটি দেশের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে কাতার ও কুয়েত। এ জন্য দেশ দুটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের দেখানো পথে হাঁটতে যাচ্ছে আরও কয়েকটি দেশ। এভাবে যদি শ্রমবাজার একেবারে সংকুচিত হয়ে পড়ে তাহলে একদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে, আরেকদিকে ওইসব দেশে কর্মরতরা দেশে ফিরে আসলে তারা বেকার হয়ে পড়বেন। এতে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিতে পারে।
এমনটিই মনে করছেন জনশক্তি রফতানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী ও অভিবাসী সংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রধান ড. তাসনীম সিদ্দিকী। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, করোনার প্রভাব সারা বিশে^ যেভাবে পড়েছে তাতে অর্থনীতির কোনো খাত রক্ষা পাবে না। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রফতানি। গত তিন মাসে এই খাতের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক 
প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, প্রাবসী শ্রমিকদের জীবনা টিকিয়ে রাখা। কারণ আমরা যারা দেশে আছি করোনার কারণে যে যে পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, নিজ দেশে আছি, নিজ ঘরে আছি। খাই না খাই নিরাপদে ঘরে আছি। কিন্তু বিদেশে যেসব শ্রমিক আছেন তাদের তো জীবন বাঁচিয়ে রাখাটাই এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে তারা কর্মহীন হয়ে পড়ে বেকার বসে আছেন, আরেকদিকে তারা এখন দেশেও আসতে পারছেন না। অনেক শ্রমিক এখন তিনবেলা খেতেও পারছেন না। সে জন্য সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্রæত কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে প্রবাসী শ্রমিকদের খাদ্য ও নিরাপদে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর শ্রমবাজারগুলো যেন হাতছাড়া না, হয় সে জন্যও কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিয়ে রাখা।
দেশে প্রতিবছর যে ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, তার এক-চতুর্থাংশের মতো আসে সৌদি আরব থেকে। দেশটি থেকে বৈধভাবে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। অবৈধ চ্যানেলে আরও ৩ বিলিয়ন ডলার আসে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ এই করোনার মহামারীতে এই দেশটি থেকেই বড় ধাক্কা আসছে শ্রম বাজারের জন্য। কারণ সৌদি আরবে শেষ হয়ে আসছে বাংলাদেশি নাগরিকদের কাজের সুযোগ।
করোনাভাইরাসের কারণে আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশটি থেকে ফিরে আসতে হবে ১০ লাখ বাংলাদেশিকে। আর যাদের কাগজপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সমস্যা আছে তাদেরকে হয়তো ফিরতে হবে কয়েক মাসের মধ্যেই। এটি ঘটলে আমাদেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহ তীব্র হোঁচট খাবে। বড় ধরনের আঘাত লাগবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। তবে শুধু করোনার প্রভাবে নয়, ওই বাংলাদেশিদের কাজ হারানোর পেছনে রয়েছে আরও কিছু কারণ। করোনা শুধু আগুনে ঘি ঢেলেছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, সৌদি সরকারের নেওয়া ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা, জ্বালানি তেলের ব্যাপক দরপতন, বিদ্যুৎচালিত গাড়ির জনপ্রিয়তা ইত্যাদি।
এই পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে সৌদি আরবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সৌদি শ্রমবাজারে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেখানে ১০ লাখ প্রবাসীর চাকরি হারানোর বিষয়টি উল্লেখ করে বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে সরকার সৌদি আরবকে একসাথে সব বাংলাদেশিকে ফেরত না পাঠানোর জন্য চাপ না দিয়ে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
একই রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও। বিশেষ করে কুয়েত ও কাতার সহসায় বিদেশিদের প্রবেশাধিকার তুলবে বলে মনে হয় না। সুতরাং আপাতত এই বৃহৎ বাজার দুটি বন্ধই থাকছে। সিঙ্গাপুরে অসংখ্য বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ জন্য সে দেশের সরকারও সহসা বাজার খুলবে না। এ অবস্থায় জনশক্তি রফতানি এ বছর অনেক কমে যাবার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখের বেশি কর্মী বিভিন্ন দেশে চাকরি নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে সর্বোচ্চ প্রায় চার লাখ, ওমানে ৭২ হাজার ৬৫৪ জন ও কাতারে গেছেন ৫০ হাজার ২৯২ জন।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারিতে গেছে ৬৯ হাজার ৯৮৮ জন এবং ফেব্রæয়ারি মাসে গেছে ৫৯ হাজার ১৩৯ জন। প্রথম দুই মাসে মিলে জনশক্তি রফতানি হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ১২৭ জন। মার্চ এবং এপ্রিল মাসের চিত্র এখনও বিমএইইটি দেয়নি। তবে প্রাথমিক সূত্রে জানা গেছে, এই দুই মাসে বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার চিত্র খুবই মন্থর। সব মিলে চলতি বছরের চার মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) মাত্র দুই লাখের মতো শ্রমিক গেছে বলে জানান বায়রার এক কর্মকর্তা।
সার্বিক বিষয়ে বায়রার যুগ্ম মহাসচিব সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বড় বাজার সৌদি আরবসহ প্রায় সব দেশের শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমরা কিছুটা শঙ্কিত কারণ চলতি বছর যে টার্গেট ছিল সেটা তো পূরণ হবেই না, এই সঙ্কটের কারণে আমরা অনেক বাজারও হারাতে পারি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

WP Twitter Auto Publish Powered By : XYZScripts.com